কিম আশ্চর্যম!

সকালটা তখনও কুয়াশায় মোড়া ছিল বলে আমিও ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরেও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম। ঘুম জড়ানো চোখেই আনন্দবাজার পত্রিকা স্ক্রল করতে-করতে একটা খবর দেখে চমকে উঠলাম- প্রয়াত কিম কি-দুক। ষাটের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিলেন মাত্র, কিন্তু তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল কোভিড-১৯। খবরটা তো সত্যিই! কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আমার অন্যতম সেরা চিত্র পরিচালক চিরতরে প্যাক আপ করে ফেলেছেন। আমাদের পৃথিবী থেকে তিনি ডিজলভড হয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি আশা করি ফেড আউট হবেন না বিশ্ব সিনেমার মানচিত্র থেকে। তাঁর মৃত্যুর খবরটা পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমার চোখের সামনে সিনেমা শেষ হওয়ার পর এন্ড ক্রেডিটের মতো ভেসে উঠতে লাগল তাঁর একটার পর একটা সিনেমার নাম। বছর দশেক আগে তাঁর থ্রি আয়রন দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। আজ তাঁর অকালমৃত্যুও আমাকে আশ্চর্য করে দিল।

দক্ষিণ কোরীয় পরিচালক কিমকে যাঁরা চেনেন তাঁরা তাঁর একটি সিনেমার কথা অবশ্যই বলবেন। সিনেমাটার নাম 'স্প্রিং, সামার, অটাম, উইন্টার... অ্যান্ড স্প্রিং'। এই সিনেমায় স্প্রিং ফিরে এলেও কিম আর ফিরবেন না। তাই তাঁর সিনেমাগুলোকেই ফিরে-ফিরে দেখা ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারি আমরা।

থ্রি আয়রন খ্যাত এই পরিচালক তাঁর ২৩ বছরের চলচ্চিত্র জীবনে মোট ৩৩টি সিনেমা করেছিলেন। তাঁর এই বিশাল সৃষ্টির মধ্য থেকে আমি মাত্র তিনটি সিনেমা দেখেছি: স্প্রিং, সামার, অটাম, উইন্টার... অ্যান্ড স্প্রিং (২০০৩), থ্রি আয়রন (২০০৪) ও পিয়েতা (২০১২)। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, গত বছর ফেসবুকে আমরা বন্ধুরা একটা খেলা খেলেছিলাম। সেখানে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলত ফেসবুকের দেওয়ালে নিজের সেরা দশটি সিনেমার নাম দেওয়ার জন্য। আমি এই প্রস্তাবটা পেয়েছিলাম কিশুদা (সৌমিত্র অধিকারী)-র থেকে। আমার সেরা দশ সিনেমার তালিকায় আমি থ্রি আয়রন সিনেমাটা রেখেছিলাম।

আমি মূলত ধীরগতির সিনেমার ভক্ত। থ্রি আয়রন সেরকমই এক ধীরগতির সিনেমা। কিন্তু এর আসল সম্পদ নীরবতা। চলচ্চিত্রের এক অন্যতম শক্তিশালী উপাদান নীরবতাকে কীভাবে বাঙ্ময় করতে হয়, তা এখানে করে দেথিয়েছেন কিম। এই ধীরগতি ও নীরবতাই আমাকে সম্মোহিত করে রেখেছিল বললেও ভুল হবে না। এই সিনেমা দেখার পরেও আমি বহুদিন ঘরে-বাইরে মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকতাম। দশ বছর আগেও সিনেমা দেখা অনেক সহজ হয়ে উঠলেও, এখনকার মতো যখন ইচ্ছে তখন দেখা যেত না। তাই ওই সিনেমাটার কথা ভাবতাম আর অনুভব করার চেষ্টা করতাম। তখনই ওই মোহাচ্ছন্ন ভাবটা চলে আসত। অনবদ্য এক রোমান্টিক সিনেমা।

পিয়েতাকে একটা থ্রিলার সিনেমা বলা চলে। চলচ্চিত্রে সেক্স ও ভায়োলেন্সের প্রয়োগ নিয়ে নানা মুনি নানা মত দিয়েছেন, কিন্তু এই সিনেমা সেদিক দিয়ে এক কথায় কাল্ট ক্লাসিক। সিনেমার গল্প এক সময় ইনসেস্ট সম্পর্কের দিকে বাঁক নেয় বলে মনে হলেও আস্তে-আস্তে গ্রন্থিমোচনে সব পরিষ্কার হয়। এই সিনেমা দর্শককে উত্তেজিত করে না, ভাবায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মদন তাঁতিকে অনুসরণ করে ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে আমি কিমের সিনে জগতে প্রবেশ করি ফের সেই ভাবা প্র্যাকটিস করার জন্য।

স্প্রিং, সামার, অটাম, উইন্টার... অ্যান্ড স্প্রিং দেখে সারারাত ঘুমোইনি। আপাত সরল এই সিনেমার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে জটিল জীবন জিজ্ঞাসা। সিনেমার নামে উল্লিখিত চারটি ঋতুর (বসন্ত ঋতুর নাম দু'বার আছে) শিরোনামে পাঁচটি পর্বে বিভক্ত এই সিনেমার বিষয় তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও বৃদ্ধ পণ্ডিত সন্ন্যাসীর সম্পর্ক। এর পটভূমি ভাসমান এক বৌদ্ধ আশ্রম। এই আশ্রম ও তাকে কেন্দ্র করে চারপাশের অনাবিল প্রকৃতিকে নিয়ে যেসব দৃশ্যায়ন আছে, তা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাশাপাশি মনও জুড়িয়ে যায়। সমালোচকদের মতে, এ এক বিরল আধ্যাত্মিক সিনেমা।

জানি না তাঁর সব সিনেমা দেখার সৌভাগ্য আমার হবে কি না, তবে প্রয়াস আছে ও থাকবে অব্যাহত। 

Comments

Popular posts from this blog

GREAT BOYS STOP WARS

প্রেমের একদিন প্রতিদিন