শ্রেষ্ঠ ছেলেরা যুদ্ধ থামায়

 স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০তম বছর চলছে। সেই উপলক্ষে আনন্দবাজার পত্রিকা-য় প্রকাশিত তানভীর মোকাম্মেলের একটি নিবন্ধ পড়ছিলাম— “’দাবায়ে রাখা যায়নি, যাবেও না: পঞ্চাশে পৌঁছল বাংলাদেশ। প্রাঞ্জল ও মনোজ্ঞ এই লেখা পড়তে-পড়তে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলায় দেখা বাংলাদেশের একটি ছেলের কথা। আমি যে-স্কুলে পড়তাম, সেখানে আমার চেয়ে দু ক্লাস নীচে পড়ত সে। আমাদের স্কুলের কোনও এক অনুষ্ঠানে সে একটা টি-শার্ট পরে এসেছিল। সেটার গ্রাফিতির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার কারণ দুটো। এক. টি-শার্টের গ্রাফিত্তি লেখা আছে বাংলায়। আজকাল এটা কোনও আশ্চর্যের বিষয় না-হলেও আমরা যে-সময় স্কুলে পড়তাম তখন টি-শার্টে বাংলা লেখা দেখতে পাওয়া যেত না। দুই. টি-শার্টে লেখা ছিল— শ্রেষ্ঠ ছেলেরা যুদ্ধে যায়। ছোটবেলায় আমি জানতাম, পড়াশোনা করা, বাবা-মা ও গুরুজনদের কথা শোনা ইত্যাদি ভাল কাজ যারা করে তারা ভাল ছেলে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ছেলে কী বস্তু তা জানতাম না। যুদ্ধ কী জানতাম। সৌজন্যে রাম-রাবণের যুদ্ধ বা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধে যাওয়া ছেলেরা যে শুধু ভালই নয়, শ্রেষ্ঠও হতে পারে, তা জানতাম না। কিন্তু ওই সময়েই আবার শহরের বিভিন্ন জায়গায়, শান্তিনিকেতনি ব্যাগে লেখা থাকা দেখতাম, যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। এখন প্রশ্ন, শান্তিই যদি চাই তাহলে যুদ্ধে যাওয়া ছেলেরা শ্রেষ্ঠ হবে কেন? আজ বহু বছর পরে দেখছি, যারা যুদ্ধ থামাতে চায়, তাদের শ্রেষ্ঠত্বেরও গুণগান করা হচ্ছে। যুদ্ধ থামানো শ্রেষ্ঠ ছেলেদের নিয়ে ন্যারেটিভ নির্মিত হতে দেখলাম দুই ব্রিটিশ পরিচালকের হাত ধরে। একজন স্যাম মেন্ডিস ও অন্যজন ক্রিস্টোফার নোলান।

২০২০ নিয়ে যত কম বলা যায় তত ভাল। তবু আমার মতো সিনে-প্রেমীর জন্য বছরটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুটো সিনেমার জন্য। স্যাম মেন্ডিসের ১৯১৭ ও ক্রিস্টোফার নোলানের টেনেট। ভারতে এ বছরের গোড়ায় মুক্তি পেয়েছিল মেন্ডিসের সিনেমাটা এবং একেবারে শেষে এসে মুক্তি পেল নোলানের সিনেমাটা। এই বছরটার দুপ্রান্তে মুক্তি পাওয়া দুটো সিনেমারই বিষয় যুদ্ধ থামানো। তবে প্রথমটা বাস্তব এবং দ্বিতীয়টা কল্প বিজ্ঞান।

১৯১৭। নিউম্যারিকেল বা সংখ্যাসূচক নামের এই সিনেমার পটভূমি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। একদিকে ব্রিটিশ ও অন্যদিকে জার্মান সেনা। ব্রিটিশ সেনা জানতে পেরেছে, জার্মানরা পিছু হটছে। কিন্তু ব্রিটিশরা পরক্ষণেই বুঝতে পারে, এটা জার্মানদের চাল। তারা আসলে অন্য দিক দিয়ে ব্রিটিশদের উপর হামলা চালাবে। তাই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ব্রিটিশ সৈন্য আর এগোবে না। যুদ্ধ থামাতে হবে। এই খবর কর্নেল ম্যাকিঞ্জিকে জানানো যাচ্ছে না, ফোন লাইন কেটে পড়ে আছে বলে। অগত্যা দুই ব্রিটিশ সৈন্যকে এই খবর দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়। উইলিয়াম স্কোফিল্ড ও টম ব্লেক নামের ওই দুই সৈন্যের দায়িত্ব যুদ্ধ থামানো।

টেনেট। প্যালিনড্রোমিক (যে-শব্দের বানান দুদিক দিয়েই এক: TENET) নামের এই সিনেমায় দেখি প্রোটাগনিস্ট বলে পরিচিত একজন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে অতীত-বর্তমান- ভবিষ্যতের মধ্যে যাতায়াত করে নানা ঘটনাকে ঠিকঠাক করে। এখানে দেখানো হয়েছে, ভবিষ্যতে এমন এক অস্ত্র বা বন্দুক তৈরি হয়েছে যার গুলি সামনের দিকে না-গিয়ে পিছন দিকে আসতে-আসতে ক্রমশ অতীতের দিকে এগিয়ে আসছে। ভবিষ্যতের কেউ এই অস্ত্র ব্যবহার করে অতীতকে ধ্বংস করে দিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করতে চায়।

মেন্ডিসের ১৯১৭-য় রয়েছে অতীত ইতিহাসের কথা। নোলানের টেনেটে শোনা যায় কাল্পনিক ভবিষ্যতের গল্প। এবার মজার বিষয়টা হল, এই দুই সিনেমার গল্প কথনের দিকগুলো। ১৯১৭ আমাদের অতীতের কথা বলতে থাকে গল্পকে অনবরত সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে। এই সিনেমা একটা জায়গা থেকে শুরু হয়ে আরেক জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে। সিনেমায় কোনও একটা স্থানকে একবারের বেশি দেখানো হয়নি। আসলে যুদ্ধ থামানোর বার্তা নিয়ে সৈনিকরা (পরে একজন সৈনিক) ক্রমশ এগিয়ে চলেছেন, সিনেমার গল্পও তাঁদের/তাঁর পিছু-পিছু চলছে। তাই একই স্থান একাধিকবার দেখানোর অবকাশই নেই। কোনও ফ্ল্যাশব্যাক নেই। এই সিনেমা এক নাগাড়ে শুধু সামনের দিকে এগোতে থাকে। সব সিনেমাই তা-ই (মেমেন্টো বাদে); তবুও গল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে-মাঝে কোনও-কোনও সিনেমায় ফ্ল্যাশব্যাক থাকে, পরবর্তী ঘটনা বলতে গিয়ে খানিক পূর্বের ঘটনাও বলা হয়। ১৯১৭-এ তা নেই।

এই সিনেমার পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে থাকে ক্রিস্টোফার নোলানের দ্বিতীয় সিনেমা মেমেন্টো। ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মেমেন্টো ক্রমশ ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে থাকা সিনেমা। এই সিনেমা বলতে গেলে শেষ থেকে শুরু হয়ে শুরুতে গিয়ে শেষ হয়। সিনেমার পর সিনেমায় নোলান সময় ও পরিসর নিয়ে খেলে আসছেন। তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত টেনেট। এর গল্প অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে আসা-যাওয়া করতে-করতে দর্শকের মাথা গুলিয়ে দেয়। সময় থেকে সময়ে যাতায়াতে নোলান একটি তত্ত্বকে কাজে লাগিয়েছেন— রিভার্স এনট্রপি। এই পৃথিবীতে সমস্ত কিছুরই ক্ষয় আছে। কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। পদার্থ বিজ্ঞানে এই বিষয়টাকেই বলে এনট্রপি। যেহেতু এই সিনেমার বিষয় ভবিষ্যৎ থেকে অতীতের দিকে ধেয়ে আসা একটা গুলি, তাই সেটাকে বলা হয়েছে রিভার্স এনট্রপি। মানে গুলিটা চালানো হল, কিন্তু সেটা সামনের দিকে এগিয়ে ফেটে না-গিয়ে ক্রমশ পিছনের দিকে চলে আসছে। যার লক্ষ্য অতীতকে ধ্বংস করা।

আমরা অতীতকে বাঁচিয়ে রাখি, অতীতকে ভুলে যাই বা ভুলে থাকতে চাই, অতীতকে বিকৃত করি। কিন্তু পুরো ধ্বংস করে দেওয়া! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রথম আলো সম্পর্কে বলেছিলেন, তির সামনের দিকে ছোঁড়ার জন্য একটু পিছিয়ে নিতে হয়। তাঁর কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, চিতার মতো সামনের দিকে দৌড়ে গেলেই হয় না, সিংহাবলোকনও করতে হয়। তাই মেন্ডিসরা অতীতের গল্প বলেন এবং নোলানরা বলেন অতীত বাঁচানোর গল্প। আসলে নয়া ইতিহাস গড়তে গেলে পুরনো ইতিহাস জানতেই হয়। কিন্তু নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে গিয়ে নতুন অতীত রচনা করাটাই যদি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নয়া বাস্তব হয়ে যায়…?

© TAPAS PAUL/20.12.2020

Comments

Popular posts from this blog

GREAT BOYS STOP WARS

কিম আশ্চর্যম!

প্রেমের একদিন প্রতিদিন